লড়াই সংগ্রামের
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) বাংলাদেশের একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল (নিবন্ধন নম্বর: ৩৬, প্রতীক: চশমা)। ১৯৮০ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকার রমনা গ্রীন চত্বরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জাগপার ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়।
পটভূমি ও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
১৯৭৪-এর দুর্নীতিবিরোধী শ্বেতপত্র প্রকাশ
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর নব্য লুণ্ঠন, চোরাচালান ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক অবস্থান নেন তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান।
১৯৭৪ সালের ৩০ মার্চ ঢাকা বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে আয়োজিত এক বিশাল ছাত্র সমাবেশে তিনি সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ ক্ষমতাসীন দলের ৬৪ জন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা বা “শ্বেতপত্র” প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও কারাবরণ
দুর্নীতিবিরোধী তালিকা প্রকাশের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে সাতজন ছাত্রকে নৃশংসভাবে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়—যা ইতিহাসে “সেভেন মার্ডার” নামে পরিচিত।
শ্বেতপত্র প্রকাশের প্রতিশোধ নিতে ও দুর্নীতি ঢাকতে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী শফিউল আলম প্রধানকে রাজনৈতিক বলির পাঁঠা বানায় এবং ৮ এপ্রিল তাঁকে প্রধান আসামি করে গ্রেপ্তার করা হয়। তৎকালীন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তড়িঘড়ি করে বিচার সম্পন্ন করে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
আইনি নির্দোষ প্রমাণ ও জাগপা প্রতিষ্ঠা
পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বাকশালের পতনের পর মামলাটির পুনঃতদন্ত করা হয় এবং আদালতের মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হন। অতঃপর ১৯৭৮ সালে দীর্ঘ ৪ বছর পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।
কারামুক্তির পর ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে শফিউল আলম প্রধান একটি নতুন আদর্শিক রাজনৈতিক ধারা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। এই চিন্তার ফসল হিসেবে ১৯৮০ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকার রমনা গ্রীনের সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি” (জাগপা)।
এক নজরে পটভূমি
ক্ষমতাসীন দলের ৬৪ জন দুর্নীতিবাজের শ্বেতপত্র প্রকাশ
প্রতিহিংসামূলক মিথ্যা মামলায় শফিউল আলম প্রধানের কারাবরণ
আদালতে পুনঃতদন্তে নির্দোষ প্রমাণ ও কারাগার থেকে মুক্তি
রমনা গ্রীন চত্বরে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) প্রতিষ্ঠা
আদর্শিক চেতনা ও দর্শনের ৪টি স্তম্ভ
ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ সর্বদা বিদেশী বলয় ও আঞ্চলিক আধিপত্যের আগ্রাসী নজরদারিতে থাকে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতিতে স্বাবলম্বিতা অর্জনই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। জাতীয় স্বার্থে কোনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক শক্তির সামনে বশ্যতা স্বীকার না করার আপসহীন নীতিই জাগপার মূল আদর্শিক চেতনা।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী জাগপার রাজনৈতিক দর্শনের মূল স্তম্ভ চারটি:
১. স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব
২. গণতন্ত্র
৩. ইসলামী মূল্যবোধ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা
৪. ইনসাফভিত্তিক স্বনির্ভর স্বদেশ
“সকল প্রকার আধিপত্যবাদের অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বময় বাংলাদেশ বিনির্মাণ যেখানে মানবিকতা ও ইনসাফ প্রতিটি নাগরিকের প্রাপ্য।”
লড়াই ও সংগ্রাম
জন্মলগ্ন থেকেই জাগপা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত। ক্ষমতার লোভে না গিয়ে রাজপথে জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে জাগপা সর্বদা আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে।
যার মাসুল হিসেবে জাগপার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মজলুম জননেতা শফিউল আলম প্রধানসহ দলের অসংখ্য নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাবরণ ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। স্বৈরাচার এরশাদ থেকে শুরু করে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসন আমল পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মীরা লাগাতার হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; অনেকে শহীদও হয়েছেন। এমনকি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে নতুন বাংলাদেশে তারেক রহমানের আমলেও জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধানের বাসভবন ও দলীয় কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে।
তবুও জাগপা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে
“লড়াই ছাড়া মেহনতি জনতার মুক্তি নাই”
দেশের সার্বভৌমত্ব ও মজলুম জনগণের অধিকার আদায়ে জাগপার রাজপথের লড়াই অবিচল থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
জোট রাজনীতি ও রাজপথের আন্দোলন
০৭ দলীয় জোট
স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোটে জাগপা রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
২০ দলীয় জোট
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে থেকে দীর্ঘ এক দশক ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেয়।
১২ দলীয় জোট
২০ দলীয় জোট বিলুপ্তির পর ফ্যাসিস্ট হাসিনাবিরোধী আন্দোলন বেগবান করতে জাগপা ১২ দলীয় জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়।
১১ দলীয় ঐক্য
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে যোগদান করে জাগপা ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।
আইনি বিজয় ও নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন
রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা অনুযায়ী ২০০৮ সালের ২০ নভেম্বর জাগপা নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে নিবন্ধন লাভ করে। তবে দীর্ঘ এক যুগ পর, ২০২১ সালের ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন ইসি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জাগপার নিবন্ধন বাতিল করে। মূলত ভারতের আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাগপার কঠোর অবস্থানের কারণেই ফ্যাসিবাদের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এই বেআইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জাগপা সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেন। দীর্ঘ ৪ বছরের আইনি লড়াই শেষে ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ মহামান্য হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের ওই সিদ্ধান্তকে বেআইনি ঘোষণা করে জাগপার নিবন্ধন বহাল রাখার নির্দেশ দেন। আদালতের রায় অনুযায়ী একই বছরের ২ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন জাগপার নিবন্ধন পুনর্বহালের প্রজ্ঞাপন জারি করে।
দলীয় প্রতীক পরিক্রমা
হুক্কা
২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের সময় জাগপার প্রথম বরাদ্দকৃত নির্বাচনী প্রতীক ছিল “হুক্কা”।
চশমা
দলের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধানের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন কমিশন জাগপার প্রতীক পরিবর্তন করে “চশমা” বরাদ্দ দেয়।
নেতৃত্ব পরিক্রমা
মরহুম শফিউল আলম প্রধান
মরহুমা অধ্যাপিকা রেহানা প্রধান
ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান
একটি আত্মমর্যাদাশীল ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রত্যয়ে
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক আপসহীন ও অদম্য ধারার নাম। ক্ষমতার মোহের তোয়াক্কা না করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় স্পষ্ট কথা বলা এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে অটল অবস্থানই দলটির মূল শক্তি। প্রতিষ্ঠাতা শফিউল আলম প্রধানের নীতি ও আদর্শকে ধারণ করে এবং নতুন প্রজন্মের আইনি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় সমৃদ্ধ নেতৃত্বকে সাথে নিয়ে জাগপা আগামী দিনে একটি আত্মমর্যাদাশীল, সার্বভৌম ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে।